যে ব্যবসার ধ্বংস নেই: দুনিয়া ও আখিরাতে শ্রেষ্ঠ মুনাফা এবং পরকালীন বিনিয়োগের এক অনন্য মহাকাব্য
এই পৃথিবীর বুকে আমরা প্রতিনিয়ত কত ব্যবসাই না করি! দিনরাত এক করে খাটি যেন ব্যবসায় একটু লাভ আসে, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ে। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন তো, পৃথিবীর এমন কোনো ব্যবসা কি আছে যা শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত? মহামারী, মন্দা, চুরি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেকোনো বড় ব্যবসাই রাতারাতি ধুলোয় মিশে যেতে পারে।
কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মহাবিশ্বে এমন একটি ব্যবসা আছে যার কোনো 'লস' বা লোকসান নেই? যে ব্যবসায় পুঁজি খাটালে লাভের অংক বাড়ে কয়েকশো গুণ, আর যার মুনাফা পাওয়া যায় মৃত্যুর পর অনন্তকালের জীবনে?
হ্যাঁ, মহান আল্লাহ তাআলা কুরআনে সেই লাভজনক ব্যবসাকেই বলেছেন 'তিজারাতান লান তাবুর' (এমন ব্যবসা যা কখনো ধ্বংস হবে না)। প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখক শায়খ আব্দুল ஜাব্বার জাহাঙ্গীর তাঁর অসাধারণ ও হৃদয়স্পর্শী গ্রন্থ ‘আল্লাহর পথে অর্থব্যয়: যে ব্যবসার ধ্বংস নেই’-এ এই ঐশী ব্যবসার আদ্যোপান্ত আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। (বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদটি আপনি "যে ব্যবসার ধ্বংস নেই-1.png" ফাইলে দেখতে পাবেন)।
বইয়ের সাধারণ পরিচিতি
- বইয়ের নাম: আল্লাহর পথে অর্থব্যয়: যে ব্যবসার ধ্বংস নেই
- লেখক: শায়খ আব্দুল জাব্বার জাহাঙ্গীর
- মূল ফোকাস: ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে খরচ), দান-সদকার গুরুত্ব, কৃপণতার কুফল এবং বরকত বৃদ্ধির উপায়।
- উপস্থাপনা শৈলী: মোটিভেশনাল, যুক্তি ও দলিলভিত্তিক এবং হৃদয়গ্রাহী।
বইটির মূল দর্শন ও অন্তর্দৃষ্টি (Core Insights)
শায়খ আব্দুল জাব্বার জাহাঙ্গীর এই বইটিতে প্রথাগত ওয়াজ বা আলোচনার বাইরে গিয়ে অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে মানুষের 'অর্থের প্রতি মোহ' এবং 'আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস'-এর ভেতরের টানাপোড়েনকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বইটির মূল আকর্ষণীয় দিকগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দান বনাম বিনিয়োগ (Donation vs Investment)
আমরা সাধারণত মনে করি কাউকে দান করলে বা আল্লাহর পথে অর্থ দিলে আমাদের পকেট থেকে টাকা কমে গেল। লেখক কুরআনের আয়াতের আলোকে আমাদের এই ভুল মানসিকতা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আল্লাহর পথে অর্থব্যয় মূলত কোনো 'দান' নয়, বরং এটি হলো আল্লাহর সাথে একটি 'বিনিয়োগ চুক্তি'। আল্লাহ স্বয়ং এই ইনভেস্টমেন্টের জামিনদার এবং তিনি এই পুঁজিকে ৭০০ গুণ বা তার চেয়েও বেশি বাড়িয়ে ফেরত দেওয়ার ওয়াদা করেছেন।
২. কৃপণতা: হৃদয়ের এক গোপন ব্যাধি
মানুষ কেন টাকা নিজের কাছে জমিয়ে রাখতে চায়? কারণ শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায়। লেখক শায়খ আব্দুল জাব্বার জাহাঙ্গীর অত্যন্ত সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে কৃপণতা মানুষের মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নেয় এবং সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সম্পদ ধরে রাখার মাঝে নয়, বরং সম্পদ সঠিক জায়গায় প্রবাহিত করার মাঝেই যে প্রকৃত সুখ ও নিরাপত্তা লুকিয়ে আছে—তা লেখক বিভিন্ন বাস্তব উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করেছেন।
"আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা হয়তো এই দুনিয়াতেই থেকে যাবে, আপনার উত্তরাধিকারীরা তা ভোগ করবে। কিন্তু যে টাকাটা আপনি আল্লাহর পথে খরচ করলেন, ঠিক সেই টাকাটাই আপনার স্থায়ী অ্যাকাউন্টে জমা হলো, যা মৃত্যুর পর আপনার সঙ্গী হবে।"
৩. ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ এবং সম্পদের বরকত
অনেকেই ভাবেন, খরচ করলে সম্পদ কমে। লেখক বইটিতে 'বরকত' (Barakah)-এর আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানটি চমৎকারভাবে বুঝিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে, সদকা বা দান করলে কখনো সম্পদ কমে না, বরং সম্পদের ভেতরের অপবিত্রতা দূর হয় এবং আল্লাহ অদৃশ্য উপায়ে সেই সম্পদে রিযিক বাড়িয়ে দেন।
৪. দানের আদব ও সঠিক খাত
শুধু টাকা দিলেই হবে না, দান করার কিছু নিজস্ব আদব আছে। খোটা দেওয়া, লোকদেখানো মানসিকতা (রিয়া) কীভাবে একটি বড় দানকে ধুলোয় মিশে দেয়, তা লেখক এই বইয়ে সতর্ক করেছেন। এছাড়া সমাজের কোন কোন খাতে (যেমন: দ্বীনি শিক্ষা, এতিম-মিসকিন, সামাজিক উন্নয়ন) অর্থ ব্যয় করলে সবচেয়ে বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা বইটিতে দেওয়া হয়েছে।
সমকালীন সমাজে কেন এই বইটি পড়া জরুরি?
আজকের পুঁজিবাদী (Capitalist) সমাজে আমরা সবাই শুধু 'জমানো'র প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। চারদিকে শুধু টাকা গোছানোর ইঁদুর দৌড়। এই অর্থলোভ আমাদের সমাজ থেকে মানবিকতা, দয়া এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য কেড়ে নিচ্ছে। ধনী আরও ধনী হচ্ছে, আর গরীব আরও অসহায় হয়ে পড়ছে।
ঠিক এই সময়ে "যে ব্যবসার ধ্বংস নেই" বইটি আমাদের মনের ভেতরের চোখ খুলে দেয়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে সম্পদের ওপর নিজের মালিকানা জাহির না করে, সম্পদকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখতে হয়। তরুণ প্রজন্ম, ব্যবসায়ী এবং সমাজের বিত্তবান শ্রেণীর মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন করতে এই বইটি একটি নীরব বিপ্লব ঘটাতে পারে।
লেখকের লেখনী ও ভাষাশৈলী
শায়খ আব্দুল জাব্বার জাহাঙ্গীরের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর চমৎকার ভাষার গাথুনি। তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ অথচ যুক্তিগ্রাহ্য ভাষায় কথা বলেন। বইটির প্রতি পৃষ্ঠায় রয়েছে কুরআন, সহীহ হাদীস এবং সালাফদের (পূর্বসূরীদের) জীবনের অনুপ্রেরণামূলক গল্প, যা পাঠককে এক মুহূর্তের জন্যও বিরক্ত হতে দেয় না। পড়তে পড়তে নিজের অজান্তেই আল্লাহর পথে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক অন্যরকম অনুভূতি জাগ্রত হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ‘যে ব্যবসার ধ্বংস নেই’ বইটির মূল বিষয়বস্তু কী?
- উত্তর: বইটির মূল বিষয়বস্তু হলো 'আল্লাহর পথে অর্থব্যয়' বা দান-সদকা। লেখক অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ খরচ করার মাধ্যমে দুনিয়াতে বরকত লাভ করা যায় এবং আখিরাতের জন্য একটি চিরস্থায়ী ঝুঁকিমুক্ত ব্যবসা বা বিনিয়োগ গড়ে তোলা যায়।
২. বইটির নামকরণ কেন এমন করা হয়েছে?
- উত্তর: দুনিয়ার সব ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি বা ধ্বংসের ঝুঁকি থাকে, কিন্তু আল্লাহর পথে অর্থব্যয় করার যে ব্যবসা, তার কোনো ধ্বংস বা লোকসান নেই। কুরআনের সূরা ফাতিরের ২৯ নম্বর আয়াতের মূল ভাবধারা থেকেই বইটির এই নামকরণ করা হয়েছে।
৩. লেখক শায়খ আব্দুল জাব্বার জাহাঙ্গীর এই বইয়ে কোন বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন?
- উত্তর: লেখক মানুষের মনের অর্থলিপ্সা ও কৃপণতার ব্যাধি দূর করার ওপর জোর দিয়েছেন। একই সাথে সঠিক নিয়তে এবং সঠিক খাতে দান করার ধর্মীয় আদব ও নিয়মাবলী আলোচনা করেছেন।
৪. এই বইটি কাদের পড়া উচিত?
- উত্তর: সমাজের প্রত্যেকটি মুসলিমের, বিশেষ করে ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী এবং বিত্তবানদের এই বইটি পড়া উচিত। এছাড়া যারা নিজেদের আয়ের মধ্যে বরকত চান এবং দানের প্রকৃত ফযীলত জানতে চান, তাদের জন্য এটি একটি শ্রেষ্ঠ গাইডবুক।