আমরা দাঈ বিচারক নই: ইসলামে দাওয়াহর প্রকৃত দর্শন ও সমাজ সংস্কারের এক কালজয়ী দিকনির্দেশনা
সমকালীন ইসলামী চিন্তাধারার ইতিহাসে চরমপন্থা, উগ্রতা এবং একে অপরকে কাফের বা গোমরাহ ঘোষণার (তাকফির) প্রবণতা এক বিশাল ক্ষত তৈরি করেছে। যখনই কোনো সমাজ বা সংগঠনে আবেগ বিবেকের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তখনই ইসলামের উদার ও মধ্যপন্থী রূপটি ঢাকা পড়ে যায়। ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে ইসলামে দাওয়াহর সঠিক পথ ও পদ্ধতি স্মরণ করিয়ে দিতে যে বইটি আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, সেটি হলো হাসান আল-হুদাইবি রচিত ‘আমরা দাঈ, বিচারক নই’ (আরবি মূল: دعاة لا قضاة)। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা এই কালজয়ী গ্রন্থটির গভীর পর্যালোচনা এবং সমকালীন প্রেক্ষাপটে এর অপরিহার্য গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বইয়ের প্রাথমিক পরিচিতি
বইটি মূলত মিশরের বিখ্যাত ইসলামী আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের দ্বিতীয় মুরশিদ (প্রধান) হাসান আল-হুদাইবি কর্তৃক রচিত। বাংলা ভাষায় অত্যন্ত সাবলীল ও চমৎকার অনুবাদ করেছেন সাদাদ হাসান। নিচে বইটির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
- বইয়ের নাম: আমরা দাঈ, বিচারক নই
- মূল লেখক: হাসান আল-হুদাইবি
- অনুবাদক: সাদাদ হাসান
- মূল বিষয়বস্তু: ইসলামী দাওয়াহর মূলনীতি, তাকফির বা কাফের ঘোষণার অসারতা এবং মধ্যপন্থা।
- পাঠক শ্রেণী: ইসলামী চিন্তাবিদ, দাঈ, তরুণ সমাজ এবং সাধারণ পাঠক।
পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যেকোনো বইয়ের গভীরতা বুঝতে হলে তার রচনার প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মিশরের কারাগারগুলোতে যখন ইখওয়ানের হাজার হাজার নেতাকর্মী তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছিলেন, তখন বন্দীদের মধ্যে এক চরমপন্থী ভাবধারার জন্ম নেয়। সায়েদ কুতুবের 'মাআলিম ফিত তরিক' (Signposts on the Road) বইয়ের কিছু তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ভুল অপপ্রয়োগ করে একদল তরুণ তৎকালীন শাসক, সমাজ এবং সাধারণ মুসলিমদের 'জাহেলী সমাজ' বা কাফের বলে আখ্যায়িত করতে শুরু করে।
কারাগারের ভেতরেই যখন এই আদর্শিক বিচ্যুতি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ইখওয়ানের তৎকালীন প্রধান হাসান আল-হুদাইবি অত্যন্ত সুচিন্তিত, তাত্ত্বিক ও কুরআন-সুন্নাহর দলিলের আলোকে এই চরমপন্থার जवाब দেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, উম্মাহর যুবকদের কাজ মানুষের ঈমান পরিমাপ করা বা বিচারকের আসনে বসে রায় দেওয়া নয়, বরং ভাঙা সমাজকে পরম মমতায় আল্লাহর দিকে ডেকে আনা। এই ঐতিহাসিক প্রয়াসেরই লিখিত রূপ হলো ‘আমরা দাঈ, বিচারক নই’।
বইটির মূল প্রতিপাদ্য ও শিক্ষণীয় দিকসমূহ
হাসান আল-হুদাইবি এই বইটিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। বইটির মূল শিক্ষাগুলোকে আমরা কয়েকটি প্রধান ভাগে আলোচনা করতে পারি:
১. দাওয়াহ বনাম বিচারিক মানসিকতা
বইটির নামই এর সবচেয়ে বড় বার্তা। একজন 'দাঈ' (আহ্বায়ক) এবং একজন 'কাজী' বা বিচারকের কাজের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। বিচারকের কাজ হলো অপরাধীকে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া, তার ভেতরে মমত্ববোধের চেয়ে আইনের কঠোরতাই মুখ্য। অন্যদিকে, একজন দাঈর কাজ হলো পরম করুণা, ভালোবাসা এবং ধৈর্য নিয়ে মানুষকে সত্যের পথে ডাকা। লেখক স্পষ্ট করেছেন যে, মহান আল্লাহ আমাদের উম্মাহর কাছে দাঈ হিসেবে পাঠিয়েছেন, মানুষের ঈমানের বিচারক হিসেবে নয়।
২. তাকফির (কাফের ঘোষণা) প্রথার ভয়াবহতা
বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে 'তাকফির' বা কোনো মুসলিমকে কাফের সাব্যস্ত করার হঠকারিতার খণ্ডন। লেখক কুরআন ও সহীহ হাদীসের অসংখ্য রেফারেন্স দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, মুখের একটি কথায় বা কোনো কবিরা গুনাহের কারণে একজন মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া যায় না, যতক্ষণ না সে স্পষ্টভাবে কুফরি প্রকাশ করে বা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতকে অস্বীকার করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কাউকে অন্যায়ভাবে কাফের বললে সেই কুফরির তকমা নিজের ওপরই ফিরে আসে।
"আমাদের দায়িত্ব মানুষকে হেদায়েতের আলো দেখানো, মানুষের ভুলত্রুটি খুঁজে তাদের জাহান্নামী বা কাফের সাব্যস্ত করা আমাদের কাজ নয়। হাশরের ময়দানে আল্লাহ আমাদের জিজ্ঞেস করবেন না কেন আমরা অমুককে কাফের ফতোয়া দিইনি, বরং জিজ্ঞেস করবেন আমরা নিজেরা কতটুকু দ্বীনের দাওয়াহ পৌঁছে দিয়েছি।"
৩. ঈমান ও আমলের পারস্পরিক সম্পর্ক
তাকফিরপন্থী বা খারেজী ভাবধারার লোকেরা মনে করে আমল চলে গেলেই ঈমান চলে যায়। হাসান আল-হুদাইবি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের শাশ্বত আকিদা তুলে ধরে প্রমাণ করেছেন যে, আমলের কমবেশি বা পাপের কারণে মানুষ গুনাহগার হতে পারে, কিন্তু সে বৃত্তের বাইরে চলে যায় না। এই তাত্ত্বিক আলোচনাটি মুসলিম যুব সমাজকে উগ্রতার চোরাবালি থেকে রক্ষা করতে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
৪. সমাজ সংস্কারে সহনশীলতা ও প্রজ্ঞা
সমাজ রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। জোরপূর্বক বা ফতোয়া দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। লেখক এই বইয়ে নববী দাওয়াহর পদ্ধতি বা 'হিকমাহ'র ওপর জোর দিয়েছেন। মানুষের অজ্ঞতাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে, তাকে ক্ষমার চোখে দেখে সংশোধনের পথ তৈরি করাই ইসলামের সৌন্দর্য।
সমকালীন প্রেক্ষাপটে বইটির প্রাসঙ্গিকতা
বইটি কয়েক দশক আগে লেখা হলেও বর্তমান যুগে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে এর প্রাসঙ্গিকতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। আজ ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামান্য মতবিরোধের জেরে একে অপরকে 'দালাল', 'কাফের', 'জাহান্নামী' কিংবা 'গোমরাহ' বলে দেওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে।
তরুণ প্রজন্ম দ্বীনের সঠিক জ্ঞান অর্জনের আগেই অন্যের ভুল ধরতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই 'জাজমেন্টাল' বা বিচারিক মানসিকতা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে খণ্ড-বিখণ্ড করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি সচেতন মুসলিম, বিশেষ করে যারা দ্বীনের পথে কাজ করছেন, তাদের জন্য এই বইটি পড়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে মতভিন্নতা বজায় রেখেও একে অপরকে সম্মান করা যায় এবং ভালোবাসার মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া যায়।
বইটির সাহিত্যিক গুণ ও অনুবাদ শৈলী
হাসান আল-হুদাইবি পেশায় একজন বিচারক (Judge) ছিলেন। তাই তার লেখার ধরণ অত্যন্ত যৌক্তিক, সুশৃঙ্খল এবং তথ্যপ্রমাণে সমৃদ্ধ। তিনি আবেগের বশে কোনো কথা বলেননি, প্রতিটি দাবির সপক্ষে শরীয়তের দলিল পেশ করেছেন।
বাংলা অনুবাদক সাদাদ হাসান অত্যন্ত প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। মূল আরবি বইয়ের ভাবার্থ এবং গাম্ভীর্য বজায় রেখে তিনি একে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য সহজপাঠ্য করে তুলেছেন। বইটির ভাষা সাবলীল হওয়ায় পড়তে গিয়ে কোথাও খটকা লাগে না।
পাঠকের জন্য শেষ কথা ও সিদ্ধান্ত
আপনি যদি ইসলামের দাওয়াহর প্রকৃত রূপ বুঝতে চান, নিজের ভেতর থেকে উগ্রতা ও অন্যের প্রতি ঘৃণা দূর করতে চান, তবে ‘আমরা দাঈ, বিচারক নই’ আপনার বুকশেলফে থাকার মতো একটি অনন্য বই। এটি কেবল একটি বই নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির এক চমৎকার মহৌষধ।
- আমাদের রেটিং: ৪.৮/৫
- কেন পড়বেন? উগ্রতা পরিহার করতে, ইসলামের উদার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে এবং দাওয়াহ কাজের সঠিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়মাবলী শিখতে বইটি আপনাকে সাহায্য করবে।
FAQ:
১. 'আমরা দাঈ, বিচারক নই' বইটির মূল লেখক কে এবং এটি কোন ভাষায় লেখা হয়েছিল?
- উত্তর: বইটির মূল লেখক মিশরের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ এবং বিচারক হাসান আল-হুদাইবি। বইটি মূলত আরবি ভাষায় 'دعاة لا قضاة' (দুআত লা কুদাত) নামে রচিত হয়েছিল।
২. বইটির নাম 'আমরা দাঈ, বিচারক নই' রাখার মূল তাৎপর্য কী?
- উত্তর: এই নামকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সমাজকে এটা বোঝানো যে, সাধারণ মানুষ বা ইসলামের আহ্বানকারীদের (দাঈ) কাজ হলো মানুষকে ভালোবেসে আল্লাহর পথে ডাকা, বিচারকের আসনে বসে কে কাফের বা কে জাহান্নামী সেই রায় দেওয়া নয়।
৩. বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই বইটির গুরুত্ব কতটুকু?
- উত্তর: বর্তমান যুগে ফেসবুক বা ইউটিউবে সামান্য মতবিরোধের জেরে একে অপরকে গোমরাহ বা কাফের বলার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে এই বইটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি তরুণ প্রজন্মকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং হিকমাহর সাথে দাওয়াহ দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি শেখায়।
৪. বইটি কি সাধারণ পাঠকদের জন্য সহজপাঠ্য?
- উত্তর: হ্যাঁ, মূল বইটি বেশ তাত্ত্বিক ও আইনি যুক্তি সমৃদ্ধ হলেও, সাদাদ হাসান অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় এর বাংলা অনুবাদ করেছেন, যা সাধারণ পাঠকদের জন্য বেশ সহজপাঠ্য।